হোম | আমাদের কথা | যোগাযোগ

শনিবার ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১০

সম্পাদকীয়

পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু ও হাইকোর্টের নির্দেশ

জনগণের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া ঘটলেও এবং বিভিন্ন পর্যায় থেকে প্রতিবাদ জানানো হলেও পুলিশ হেফাজতে মানুষের মৃত্যু ঘটছেই। গ্রেফতারকৃতরা কখনো কথিত এনকাউন্টার বা ক্রসফায়ারে মারা যাচ্ছে, কখনো আবার বলা হচ্ছে, অসুস্থতায় মৃত্যু ঘটেছে তাদের। অন্যদিকে নিহতদের স্বজনরা আনছেন হত্যার অভিযোগ। বলছেন, দাবি অনুযায়ী পুলিশকে টাকা না দেয়ায় তাদের রিমান্ডে নেয়া হচ্ছে এবং নিষ্ঠুরভাবে নির্যাতন করার পরিণতিতেই গ্রেফতারকৃতদের মৃত্যু ঘটছে। কিন্তু কোনো ক্ষেত্রেই নিরপেক্ষ তদন্ত হচ্ছে না। কারণ, ক্ষমতাসহ তদন্তের দায়িত্বও হত্যার দায়ে অভিযুক্ত পুলিশই পাচ্ছে। ফলে একদিকে সত্য অপ্রকাশিত থেকে যাচ্ছে, অন্যদিকে পুলিশকে শাস্তির সম্মুখীন করা হচ্ছে না বলে পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনাও বন্ধ হওয়ার পরিবর্তে বেড়ে চলেছে। গত এক সপ্তাহে মৃত্যু ঘটেছে আরো তিনজনের। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এতটাই মারাত্মক হয়ে উঠেছে যে, দেশের সর্বোচ্চ আদালতকে পর্যন্ত হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে। গত ৫ জুলাই পুলিশ হেফাজতে তিন মৃত্যুর ব্যাপারে নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। ঘটনায় অভিযুক্ত গুলশান ও দারুস সালাম থানার দুই ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে সশরীরে হাজির হতে বলা হয়েছে।

দু'জন মাননীয় বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত ডিভিশন বেঞ্চ পুলিশের হেফাজতে আটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার এবং হত্যা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। দোষী পুলিশদের কেন ফৌজদারী আইনের আওতায় আনার নির্দেশ দেয়া হবে না তা জানতে চেয়ে একটি রুলও জারি করেছেন মাননীয় বিচারপতিরা। এতে তিন সপ্তাহের মধ্যে সরকারের সংশ্লিষ্টদের জবাব দিতে বলা হয়েছে। ডিভিশন বেঞ্চ জানতে চেয়েছেন, পুলিশ হেফাজতে একই সঙ্গে তিনজনের মৃত্যুর ঘটনায় কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে কি না এবং এ ধরনের মৃত্যু প্রতিরোধে কি ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। ডিএমপি কমিশনারকে দু' সপ্তাহের মধ্যে এর জবাব দিতে নির্দেশ দিয়েছেন মাননীয় বিচারপতিরা। স্বরাষ্ট্র সচিবকে দেয়া অন্য এক নির্দেশে তারা এক সপ্তাহের মধ্যে পর্যাপ্ত সময় দিয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করতে বলেছেন, যে কমিটিতে পুলিশের কাউকে সদস্য রাখা যাবে না।
সর্বোচ্চ আদালতের এসব নির্দেশের মধ্য দিয়ে আসলে পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর ভয়াবহতাই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বস্তুত বিশেষ করে বর্তমান সরকারের আমলে দেখা যাচ্ছে, পুলিশের কাছে মানুষের যেখানে নিরাপদ আশ্রয় পাওয়ার কথা সেখানে একশ্রেণীর পুলিশ উল্টো ঘাতক ও নির্যাতনকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছে। পুলিশের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও ব্ল্যাকমেইলিং-এর অভিযোগ উঠেছে প্রথম থেকে। চোর-ডাকাত-ছিনতাইকারী ও সন্ত্রাসীসহ অপরাধীদের সঙ্গে পুলিশের সম্পর্ক ও যোগসাজশ নিয়েও অনস্বীকার্য অনেক অভিযোগ রয়েছে। এসবের সঙ্গেই যুক্ত হয়েছে পুলিশ হেফাজতে হত্যার অভিযোগ। দেখা যাচ্ছে, যে অভিযোগেই কাউকে গ্রেফতার করা হোক না কেন, আদালতের ওপর প্রভাব খাটিয়ে অথবা বিচারকদের বিভ্রান্ত করে পুলিশ গ্রেফতারকৃতদের রিমান্ডে নিচ্ছে।

আর রিমান্ডে নেয়ার অর্থই হলো, গ্রেফতারকৃতদের নিষ্ঠুরভাবে নির্যাতন করা হবে। বাস্তবে শুধু নির্যাতনই করা হচ্ছে না, নির্যাতনের পরিণতিতে অনেকের শেষ পর্যন্ত মৃত্যুও ঘটছে। পুলিশের বদৌলতে সব মিলিয়েই রিমান্ড আজকাল এক ভীতিকর বিষয়ে পরিণত হয়েছে। অথচ আইনের চোখে অভিযুক্তের কাছ থেকে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে তথ্য আদায় করাই রিমান্ডের উদ্দেশ্য। প্রচলিত আইন বা সংবিধান রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করার অধিকার দেয়নি, হত্যার অনুমতি তো নয়ই। রিমান্ড সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক আইনেও রিমান্ডে নির্যাতন চালানো নিষিদ্ধ রয়েছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ সরকারের পুলিশ শুধু চোর-ডাকাত-খুনী ও সন্ত্রাসী ধরনের অপরাধীদেরকেই রিমান্ডে নিচ্ছে না, সাংবাদিক ও সম্পাদক থেকে জাতীয় পর্যায়ের সম্মানিত রাজনৈতিক নেতাদেরকেও রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন চালাচ্ছে। পুলিশ হত্যাকান্ড পর্যন্ত ঘটাচ্ছে। কোনো কোনো ঘটনায় এলিট ফোর্স র্যা বও জড়িত হচ্ছে পুলিশের সঙ্গে। রীতিমতো গল্প বানিয়ে তারা এনকাউন্টার বা ক্রসফায়ারের পক্ষে যুক্তি তৈরি করছে। কিন্তু সত্য প্রকাশিত হওয়া সত্ত্বেও পুলিশের কোনো একজনকেই এ পর্যন্ত বিচার বা শাস্তির সম্মুখীন হতে হয়নি। র্যা বের ক্ষেত্রেও একই কথা সত্য। উদ্বেগের বিষয় হলো, হত্যার পাশাপাশি এমনভাবেই ভীতি-আতংক ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে যে, সুস্পষ্ট সাক্ষ্য-প্রমাণ থাকার পরও মৃতদের স্বজনরা আইনের আশ্রয় পর্যন্ত নেয়ার সাহস পাচ্ছেন না।

আলোচ্য তিন মৃত্যুর ঘটনায় উদ্যোগী হয়েছিল দুটি মানবাধিকার সংগঠন। হাইকোর্টে রিটও তারাই করেছিল। এর মধ্য দিয়ে পরিষ্কার হয়েছে, পুলিশ যেহেতু বেআইনি কাজ করছে সেহেতু আদালতের দ্বারস্থ হলে প্রতিটি হত্যার বিরুদ্ধেই ন্যায়বিচার পাওয়া সম্ভব। আমরা মনে করি, হাইকোর্টের মাননীয় বিচারপতিরা তাদের মূলকথায় পুলিশের হেফাজতে যাতে আর কোনো অভিযুক্ত ব্যক্তির মৃত্যু না ঘটে সে নির্দেশই দিয়েছেন। পুলিশের প্রতি অনাস্থার দিকটিও প্রকটভাবেই সামনে এসেছে। কারণ, ডিভিশন বেঞ্চ তদন্ত কমিটিতে পুলিশের কাউকে সদস্য রাখতে নিষেধ করেছেন। বিষয়টি নিয়ে বিশেষ করে ক্ষমতাসীনদের চিন্তা করা দরকার। কেননা, এই অভিযোগ রয়েছে যে, মূলত তাদের প্রশ্রয় ও সমর্থনকে পুঁজি করেই পুলিশ বেআইনি বিভিন্ন কাজ করার, এমনকি রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন চালানোর এবং হত্যা করার সাহস পাচ্ছে। সুতরাং সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী পদক্ষেপ নিতে হলে প্রথমে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে সরকারের নীতি ও কার্যক্রমে পরিবর্তন ঘটাতে হবে। সরকারকে অবশ্যই আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে এবং পুলিশকে দিয়ে দলীয় কর্মীর মতো কাজ করানো বন্ধ করতে হবে। আমরা আশা করতে চাই, সরকার সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে এবং পুলিশের হেফাজতে যাতে আর কোনো মৃত্যু না ঘটে তা নিশ্চিত করবে। সরকারকে রিমান্ডে নেয়ার বেআইনি কর্মকান্ড থেকেও নিবৃত্ত হতে হবে।

আর্কাইভ