হোম | আমাদের কথা | যোগাযোগ

শনিবার ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১০

নির্বাচিত কলাম

সম্ভাব্য নাশকতার নেপথ্য কথা

এম. আবদুল হাফিজঃ সাংঘর্ষিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষগুলোর মধ্যে ক্ষমতাসীনরা এক প্রকার জরুরি অবস্থার আবহ সৃষ্টি করে ভীতসন্ত্রস্ত জনগণকে প্রশ্নাতীত আনুগত্য প্রদানে বাধ্য করে। রাজনীতির এ মনস্তাত্তি্বক খেলা পাকিস্তান আমলেও আমরা এন্তার দেখেছি। ইদানীং আমাদের মহাজোট সরকারও কারণে-অকারণে এ খেলায় প্রবৃত্ত হয়েছে; অথচ দেশের ও দশের সার্বিক স্বার্থের বিবেচনায় এ খেলা ঝুঁকিপূর্ণ। বলা হচ্ছে, দেশে জঙ্গি তৎপরতা এবং গ্রেপ্তারকৃত শীর্ষ জামায়াত নেতাদের জঙ্গি কানেকশনের কারণে দেশ নাশকতার মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা আছে। আওয়ামী লীগের একটি মহল এবং গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব এ আশঙ্কার পুনরাবৃত্তি করে চলেছে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও এ জন্য রেড অ্যালার্টে আছে। এ পর্যন্ত নাশকতার কোনো উল্লেখযোগ্য ঘটনা না ঘটলেও সাধারণ মানুষ ইতিমধ্যেই মনস্তাত্তি্বক অস্বস্তিতে আছে। এর ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য-বিনিয়োগ এবং সর্বোপরি দেশের সার্বিক অর্থনীতিও স্নায়বিক চাপে পড়েছে। স্তিমিত হয়ে পড়েছে অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি তৎপরতা।

অধুনা ভীতি সৃষ্টি করে মানুষকে স্নায়বিক চাপে রাখাও এক ধরনের রাজনৈতিক কৌশল। এ অনিশ্চয়তা বিরাজ করতে থাকে এবং ক্ষমতাসীনরাও হার্ডলাইনে যাওয়ার বা যথেচ্ছাচারের ছুতো পায়। ইতিমধ্যেই মহাজোটের শাসনকাল দেড় বছর পেরোতে না পেরোতেই রাজনীতিতে উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে। বিরোধী দল সরকারকে নির্বিঘ্নে দেশ পরিচালনায় আর ছাড় দিতে প্রস্তুত নয়। মহাজোটের জন্য এদের ঠেকিয়ে রাখাও মর্যাদার ব্যাপার। তা ছাড়া বিরোধী দলের অর্থাৎ বিএনপির অতীত রেকর্ডও তো ভালো নয়। মহাজোটে কিছু সজ্জন থাকলেও এবং ভালো রাজনৈতিক আচরণের পক্ষপাতী হলেও অধিকাংশই টিট ফর ট্যাটের সমর্থক। যেভাবে মহাজোট তথা আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা জোট সরকারের আমলে নিগৃহীত হয়েছেন, মাঠপর্যায়ের আওয়ামী লীগ কর্মীরা কড়ায়গণ্ডায় তার প্রতিশোধ নিতে চান, যদিও বা অপেক্ষাকৃত কম নিপীড়িত নেতারা তাঁদের স্বভাবসিদ্ধ উদারতা প্রদর্শনে রাজি।

সাধারণ মানুষের মনে স্বভাবতই নানা প্রশ্ন দেশে নাশকতার আশঙ্কা নিয়ে। কী ধরনের নাশকতা, কেন নাশকতা, কারা তা করবে_ইত্যাকার প্রশ্ন মানুষের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে। এর আগেও যখন ফজলে নূর তাপসের মতিঝিলের অফিসে হামলা হয়েছিল, কাকতালীয়ভাবে সময়টা ছিল বঙ্গবন্ধুর খুনিদের ব্যাপারে চূড়ান্ত আইনি প্রস্তুতি, চলছিল তাদের বিষয়ে আদালতের রায় কার্যকর করার প্রক্রিয়া। তখনো ভীতি ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, খুনিদের সমর্থকরা তৎপর খুনিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পথে বিঘ্ন সৃষ্টি করতে। শেষ পর্যন্ত খুনিদের মৃত্যুদণ্ড সুচারুরূপে কার্যকর হয়েছিল এবং তার বিরুদ্ধে পরে আর কোনো তৎপরতার কথা শোনা যায়নি।

একটি দেশের নির্বাচিত সরকার কোনো মামুলি ব্যাপার নয়। সরকারের যেকোনো বৈধ পদক্ষেপ বাধাগ্রস্ত করার কেউ রাষ্ট্র-কাঠামোর মধ্যে নেই। বঙ্গবন্ধুর খুনিদের ব্যাপারে আদালতের রায় কার্যকর করতে তাই সরকার কোনো মহল থেকে কোনোভাবে বাধাগ্রস্ত হয়নি। অথচ ওই সময় সরকার তার বিরুদ্ধে অনেক ষড়যন্ত্রের আন্দাজ অনুমান করেছিল, যা সাধারণ মানুষকেও কিছুদিনের জন্য শঙ্কার মধ্যে রেখেছিল। এখনো একইভাবে বলা হচ্ছে, বিরোধী দলের জামায়াত সম্পৃক্ততা (যদিও এ নিয়ে বিএনপির মধ্যে যথেষ্ট বিতর্ক আছে) এবং গ্রেপ্তারকৃত জামায়াত নেতাদের জন্য বিএনপির সহানুভূতি ও সমর্থন এটাই প্রমাণ করে, তারা যুদ্ধাপরাধের বিচার ব্যাহত করতে চায়। অথচ সরকার স্বয়ং এই বিচারে যে দীর্ঘসূত্রতা অবলম্বন করেছে তাতে জনগণের মনে ক্রমেই সংশয় দানা বেঁধে উঠছে যে আদৌ এ বিচার হতে যাচ্ছে কি না। বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তিত্ব যারা এ বিচারের জন্য শুরু থেকেই সোচ্চার তারা তাদের দাবি পুনর্ব্যক্ত করছে।

মহাজোট তথা আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির শীর্ষে ছিল যুদ্ধাপরাধের বিচার এবং নির্বাচিত হওয়ার পরও সংসদে পুনরায় নির্বাচিত সদস্যরা যুদ্ধাপরাধের বিচারের শপথ গ্রহণ করেছেন। কিন্তু গত দেড় বছরে যুদ্ধাপরাধের বিচারে যে অগ্রগতি আমরা দেখেছি তা তাঁদের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সংগতিহীন। যদিও আওয়ামী লীগ নেতারা মাঝেমধ্যেই এ বিচারের ব্যাপারে হুঙ্কার ছাড়েন, কিন্তু কার্যত এমন কোনো প্রস্তুতি সরকারের আছে বলে অনেকেই মনে করেন না। গত দেড় বছরে বিচারের স্থান নির্বাচন নিয়ে কালক্ষেপণ হয়েছে। কালক্ষেপণ হয়েছে বিচার-প্রক্রিয়া নির্ধারণকে ঘিরে। ট্রাইব্যুনালে অন্তর্ভুক্ত জনৈক আমলা আবদুল মতিনের জামায়াত সম্পৃক্ততা নিয়ে দীর্ঘ বিতর্ক হয়েছে। এতে বোঝা যায়, সরকারের অভ্যন্তরেই বিষয়টি নিয়ে লেজে-গোবরে অবস্থা। তা ছাড়া জামায়াতের শীর্ষ নেতারা তো সমসাময়িক রাজনৈতিক তৎপরতায় তাঁদের বিচ্যুতির জন্য গ্রেপ্তার হয়েছেন। তাঁদের গ্রেপ্তারের পেছনে কি আদৌ যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ ছিল? শুধু গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদের সময়ই তাঁদের এ অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ততা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। জনগণের মনেও একটি ধারণা সৃষ্টি হয়েছে যে সম্ভবত যুদ্ধাপরাধের দায়েই তাঁরা গ্রেপ্তার হয়েছেন এবং বিচার সমর্থক মহলটিও এ সুযোগে বিচারের দাবিতে সোচ্চার হয়েছে।

নানা ব্যর্থতায় এবং সংকটে নিপতিত মহাজোট সরকারও এ সাংঘর্ষিক, ধোঁয়াশা ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতিকে নিজেদের স্বার্থের অনুকূলে ব্যবহার করতে চায়। তাই কি তাদের নাশকতার এ ধুয়া? কিন্তু এতে জনগণ ভবিষ্যৎ নিয়ে আস্থা হারায়, তারা এই পক্ষ বা ওই পক্ষে বিভক্ত হয়ে পড়ে, যা দেশের জন্য কল্যাণকর নয়। দেশে বিশাল ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত একটি সরকার বহাল আছে। আমরা বিশ্বাস করতে চাই, তাদের বিবেচনা, মেধা এবং রাষ্ট্র প্রদত্ত শক্তি দিয়ে যেকোনো নাশকতাকে মোকাবিলা করতে তারাই যথেষ্ট।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অব্যবহিত পর, স্নায়ুযুদ্ধের শুরুতে মার্কিন মুলুকে একটি ভয়াবহ মনস্তাত্তি্বক ব্যাধির উপসর্গ দেখা দিয়েছিল। ম্যাকার্থিজম (MacArthysm) নামে উপসর্গ পুরো যুক্তরাষ্ট্রকে ছেয়ে ফেলেছিল। মার্কিনিদের মনস্তত্ত্বে এর প্রভাবে যে কাউকে কমিউনিস্ট বা কমিউনিস্ট সমর্থক মনে হতো; যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ পরস্পরকে অবিশ্বাস করতে শুরু করেছিল এবং ক্রমে বিভক্ত হয়ে পড়ছিল। স্মরণ করা যেতে পারে, ওই সময় সোভিয়েত ইউনিয়নকে পারমাণবিক তথ্য পাচারের অভিযোগে রোজেনবার্গ দম্পতিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।

আমরা আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিতে নিজেদের সম্বন্ধে নিজেরা নিশ্চিত হতে চাই। Scare mongering একটি ভয়ানক রাজনৈতিক ব্যাধি। আমাদের অসুস্থ রাজনীতি থেকে এর অবসান হোক।

লেখক : সাবেক মহাপরিচালক, বিআইএসএস ও কলামিস্ট

আর্কাইভ